পাঁচথুপির সিংহবাহিনী বাড়ির দুর্গাপুজো | স্বপ্নাদেশ, অষ্টধাতুর দেবী ও প্রাচীন ঐতিহ্য | Joyram Production

🎬 JOYRAM PRODUCTION HOUSE

বাংলার ঐতিহ্য • ধর্ম • সংস্কৃতি • ইতিহাস

পাঁচথুপির সিংহবাহিনী বাড়ির দুর্গাপুজো | স্বপ্নাদেশ, অষ্টধাতুর দেবী ও প্রাচীন ঐতিহ্য | Joyram Production

মুর্শিদাবাদ জেলার বড়ঞা অঞ্চলের ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে অবস্থিত পাঁচথুপি বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এই এলাকার বহু পুরনো দেবালয় ও বনেদি পরিবারের পুজোর মধ্যে সিংহবাহিনী বাড়ির দুর্গাপুজো বিশেষ আকর্ষণীয়।

এই দুর্গোৎসবকে ঘিরে রয়েছে দীর্ঘ পারিবারিক পরম্পরা, লোকবিশ্বাস, স্বপ্নাদেশ এবং শাক্ত সাধনার নানা প্রাচীন রীতি। প্রাপ্ত বর্ণনা অনুযায়ী, এই পুজোর ঐতিহ্য কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসছে।

সিংহবাহিনী দেবীর আগমনের কাহিনি

সিংহবাহিনী দেবীর সঙ্গে ঘোষ হাজরা পরিবারের সম্পর্কের সূচনাকে ঘিরে একটি প্রচলিত লোককাহিনি রয়েছে। পরিবারের পূর্বপুরুষ দেবী দাস ঘোষ হাজরা-কে স্বপ্নের মাধ্যমে দেবী নিজের ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন বলে পারিবারিক ঐতিহ্যে বলা হয়।

স্বপ্নাদেশে দেবীর আগমন

প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, সেই সময় দেবী বর্ধমানের পাণ্ডুয়া অঞ্চলের এক ব্রাহ্মণ পরিবারের কাছে পূজিতা ছিলেন। ব্রাহ্মণও স্বপ্নাদেশ পান যে দেবীকে পাঁচথুপিতে নিয়ে যেতে হবে।

পরবর্তীতে নদীর তীরে দেবীর বিগ্রহ দেবী দাস ঘোষ হাজরার হাতে সমর্পণ করা হয়। সেই সময়ের আবেগঘন বিদায়পর্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি আশ্চর্যজনক লোকবিশ্বাস—সিংহবাহিনী অষ্টধাতুর বিগ্রহের সঙ্গে থাকা লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মূর্তিও তাঁর কাছে এসে পড়ে।

এরপর সিংহবাহিনী দেবীর অষ্টধাতুর বিগ্রহকে শ্রদ্ধার সঙ্গে মাথায় বহন করে পাঁচথুপিতে এনে প্রতিষ্ঠা করা হয় বলে প্রচলিত রয়েছে।

অষ্টধাতুর সিংহবাহিনী ও দুর্গাপুজো

বর্তমানে সিংহবাহিনী দেবীর জন্য পৃথক নিত্যপূজার ব্যবস্থা রয়েছে। দুর্গাপুজোর সময় প্রাচীন অষ্টধাতুর বিগ্রহকে বিশেষভাবে দুর্গামন্দিরে আনা হয়।

এর পাশাপাশি মৃন্ময়ী দুর্গাপ্রতিমাও নির্মাণ করা হয়। ফলে দুর্গোৎসবের দিনগুলিতে প্রাচীন অষ্টধাতুর দেবী এবং মৃন্ময়ী প্রতিমা—দুই রূপেই মাতৃআরাধনা সম্পন্ন হয়।

দেবীর অনন্য বিগ্রহ

সিংহবাহিনী বাড়ির দুর্গাপুজোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল দেবীর রূপ। এখানে প্রচলিত দশভুজা দুর্গার পরিবর্তে চতুর্ভূজা মহিষমর্দিনী রূপের দেবীকে দেখা যায়।

দেবীর চার হাতের অস্ত্র

দেবীর উপরের দুই হাতে শঙ্খ ও চক্র এবং নিচের দুই হাতে মহিষাসুর দমনের ভঙ্গি ফুটে উঠেছে বলে প্রদত্ত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। দেবীর দুই পাশে কার্তিক ও গণেশের অবস্থানও এই বিগ্রহের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

শ্রী আদ্যা শক্তিপীঠ বুম, টনকপুর | শারদা নদীর তীরে দেবী আরাধনা ও ভ্রমণ গাইড

জয়দুর্গা রূপের সঙ্গে সাদৃশ্য

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, দেবীর এই বিশেষ রূপ ওড়িশার জয়দুর্গা আরাধনার সঙ্গে তুলনা করা হয়।

সিংহবাহিনী মন্দিরের স্থাপত্য

মন্দিরটির স্থাপত্যও যথেষ্ট আকর্ষণীয়। বর্তমান মন্দিরটি ত্রিতলবিশিষ্ট এবং তার উপরে একটি সুউচ্চ শিখর রয়েছে।

মন্দিরের স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য

  • প্রথম দুটি স্তর অষ্টকোণাকৃতি।
  • তৃতীয় স্তর ধীরে ধীরে সরু হয়ে শিখরে উঠেছে।
  • শিখরের উপর আমলক ও পতাকাদণ্ড রয়েছে।
  • গর্ভগৃহের সামনে দশমহাবিদ্যার মূর্তির উল্লেখ রয়েছে।
  • উপরের অংশে দশাবতারের অলংকরণ দেখা যায়।
  • প্রবেশপথের কাঠের কারুকার্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বোধন থেকেই শুরু হয় মাতৃবন্দনা

সিংহবাহিনী বাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনা হয় বোধনের দিন থেকে। পাশের শিবসাগর পুকুর থেকে মঙ্গলঘটের জল আনার প্রথা রয়েছে। পরিবারের মেয়ে ও বউরা শাস্ত্রাচার মেনে ঘট এবং দেবীকে বরণ করে পুজোর সূচনা করেন।

এরপর চণ্ডীপাঠ, পূজা, হোমযজ্ঞ এবং ভোগ নিবেদনের বিভিন্ন আচার ক্রমশ সম্পন্ন হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন যজ্ঞের পর দেবীকে ভোগ নিবেদন করার রীতিও প্রচলিত।

প্রতিদিন নতুন পিতলের বাসনে ভোগ

সাম্প্রতিক বর্ণনায় প্রতিদিন নতুন পিতলের বাসনে দেবীর উদ্দেশে ভোগ নিবেদনের একটি পারিবারিক রীতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

সপ্তমীর অধরাত্রি পুজো

এই দুর্গাপুজোর অন্যতম উল্লেখযোগ্য আচার হল সপ্তমীর অধরাত্রি পুজো। গভীর রাতে বিশেষ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবীর আরাধনা করা হয়।

এই পুজোর সময় প্রচলিত বাদ্যযন্ত্রের পরিবর্তে নীরব পরিবেশে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে পূজা সম্পন্ন করার ঐতিহ্যের কথা পাওয়া যায়।

যজ্ঞ, বলিদান ও বিশেষ শাক্তাচার

সিংহবাহিনী বাড়ির পুজোয় প্রাচীন শাক্তাচারের বিভিন্ন নিদর্শন আজও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সপ্তমীর রাত্রির বিশেষ পুজোর সঙ্গে হোমযজ্ঞ ও বলিদানের রীতির কথাও প্রদত্ত বিবরণে রয়েছে।

অতীতে এই পুজোর সঙ্গে আরও বিস্তৃত তান্ত্রিক আচার যুক্ত ছিল বলে পারিবারিক ঐতিহ্যে উল্লেখ পাওয়া যায়।

বিজয়া দশমীর পরেও শেষ হয় না পুজো

সাধারণভাবে মৃন্ময়ী প্রতিমার বিসর্জনের সঙ্গে দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু পাঁচথুপির সিংহবাহিনী বাড়ির ঐতিহ্যে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

ত্রয়োদশীর বিশেষ পুজো

দশমীর বিসর্জনের পরেও ত্রয়োদশীর দিন সিংহবাহিনী দেবীর বিশেষ পুজো অনুষ্ঠিত হয়। এই বিশেষ আচার সম্পন্ন হওয়ার পরেই পরিবারের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে বলে প্রদত্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

গ্রামদেবীর আরাধনা

দুর্গোৎসব শেষ হওয়ার পর গ্রামবাসীর মঙ্গল ও কল্যাণ কামনায় গ্রামদেবীর পুজোর রীতিও রয়েছে। এর ফলে সিংহবাহিনী বাড়ির দুর্গাপুজো কেবল একটি পরিবারের উৎসব না থেকে পাঁচথুপি গ্রামের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে উঠেছে।

আজও বেঁচে আছে বনেদি বাংলার ঐতিহ্য

সময়ের পরিবর্তনে জমিদারি ব্যবস্থা ও পুরনো সামাজিক কাঠামো অনেকটাই বদলে গেছে। কিন্তু সিংহবাহিনী মায়ের আরাধনার ধারায় ছেদ পড়েনি।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঘোষ হাজরা পরিবারের সদস্যরা নিষ্ঠার সঙ্গে এই পুজো করে চলেছেন। দুর্গাপুজোর সময় দূরদূরান্ত থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরাও পাঁচথুপিতে আসেন।

ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে শরতের আকাশ, ধূপ-ধুনোর গন্ধ, শাক্ত মন্ত্রোচ্চারণ এবং প্রাচীন পুজোর আচার—সব মিলিয়ে এখানে আজও বাংলার বনেদি দুর্গোৎসবের একটি ঐতিহ্যবাহী আবহ অনুভব করা যায়।

পাঁচথুপি সিংহবাহিনী বাড়ির ঠিকানা

সিংহবাহিনী বাড়ি
পাঁচথুপি,
বড়ঞা ব্লক,
মুর্শিদাবাদ,
পশ্চিমবঙ্গ।

কীভাবে যাবেন?

কান্দি থেকে পাঁচথুপি

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, পাঁচথুপি কান্দি থেকে সড়কপথে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। কান্দি হয়ে বাস বা গাড়িতে পাঁচথুপি পৌঁছানো যায়।

বহরমপুর থেকে

বহরমপুর থেকেও কান্দি হয়ে সড়কপথে পাঁচথুপি যাওয়া সম্ভব। যাত্রার আগে বর্তমান রাস্তার অবস্থা ও স্থানীয় পরিবহণের সময়সূচি যাচাই করে নেওয়া ভালো।

Joyram Production House-এর নিবেদন

বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো, প্রাচীন মন্দির, লোকঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি এবং হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহাসিক কাহিনিগুলি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই আমাদের এই প্রচেষ্টার অন্যতম উদ্দেশ্য।

Joyram Production House ভবিষ্যতেও বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিভিন্ন গল্প, মন্দির, উৎসব এবং মানুষের বিশ্বাসকে তথ্যভিত্তিক ও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করবে।

উপসংহার

পাঁচথুপির সিংহবাহিনী বাড়ির দুর্গাপুজো কেবল একটি বার্ষিক উৎসব নয়; এটি একটি দীর্ঘ পারিবারিক ঐতিহ্য, লোকবিশ্বাস, শাক্তাচার এবং বাংলার সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ। অষ্টধাতুর প্রাচীন বিগ্রহ, চতুর্ভূজা মহিষমর্দিনী রূপ, অধরাত্রির পুজো এবং ত্রয়োদশীর বিশেষ আরাধনা এই পুজোকে একটি স্বতন্ত্র ঐতিহ্যের পরিচয় দেয়।

ময়ূরাক্ষীর তীরে পাঁচথুপির এই প্রাচীন পুজো আজও মনে করিয়ে দেয়—বাংলার ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় নয়, মানুষের বিশ্বাস, পারিবারিক পরম্পরা এবং উৎসবের মধ্যেও বেঁচে থাকে।


📍 তথ্য ও কৃতজ্ঞতা

এই নিবন্ধটি প্রদত্ত উপাদানের ভিত্তিতে নতুন ভাষা ও বিন্যাসে রচিত। মূল তথ্যের বাইরে অতিরিক্ত দাবি যোগ করা হয়নি।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা: শ্রীমান বিক্রমজিৎ দাস ভাই।

🙏 দুর্গা (প্রণব) তৎ সৎ
শ্রী শ্রী দুর্গাব্রহ্মার্পণমস্তু


🔖 SEO Keywords

পাঁচথুপি সিংহবাহিনী বাড়ি, পাঁচথুপি দুর্গাপুজো, সিংহবাহিনী দুর্গাপুজো, মুর্শিদাবাদ বনেদি বাড়ির পুজো, Murshidabad Durga Puja, Panchthupi Durga Puja, Singhabahini Temple, Singhabahini Bari, Panchthupi Murshidabad, Bengal Heritage Durga Puja, Bengali Temple History, Bonedi Bari Puja, Shaktachara, Durga Puja 2026

🏷️ Hashtags

#JoyramProductionHouse #Panchthupi #Singhabahini #Murshidabad #PanchthupiDurgaPuja #DurgaPuja #DurgaPuja2026 #Durgamaa #BonediBari #BengalHeritage #MurshidabadHistory #BengalCulture #SinghabahiniBari #ShaktiPuja #WestBengal #Durga

```

Post a Comment

0 Comments